মাল্টার ব্যবসায়ী ফেনেকের সঙ্গে সালমান এফ রহমানের যোগসূত্র ও হাসিনাকে ফেরাতে লবিং
স্টাফ রিপোর্টার: ২০১৭ সালে পানামা পেপার্স ফাঁস করা সাংবাদিক ডাফনে কারুয়ানা গালিজিয়াকে গাড়ি বোমা হামলায় হত্যার ঘটনায় জড়িত মাল্টার ব্যবসায়ী ইয়োরগেন ফেনেক-এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ব্যবসায়িক সম্পর্কের তথ্য সামনে এসেছে। মাল্টার অনুসন্ধানী গণমাধ্যম দ্য শিফট-এর বরাতে এই তথ্য জানা গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকেই ফেনেক ও সালমান এফ রহমানের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি হয়। কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় একটি “এনার্জি হাব” স্থাপনের লক্ষ্যে বেক্সিমকোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে ফেনেক নেদারল্যান্ডসের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রয়্যাল হাসকোনিং ডিএইচভি (RHDHV)-কে ২৯৩,০০০ মার্কিন ডলার প্রদান করেছিলেন। পরিকল্পনার মধ্যে ছিল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (LPG) সুবিধা এবং মাল্টার মডেল অনুসরণ করে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) প্ল্যান্ট স্থাপন।

ফাঁস হওয়া ইমেইল থেকে জানা যায়, ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও দুবাইতে সালমান এফ রহমান, ফেনেক ও পরামর্শকদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। পরে ২০১৯ সালে সাংবাদিক গালিজিয়ার হত্যার মামলায় ইয়োরগেন ফেনেককে গ্রেফতার করা হয়। এ বছরের জানুয়ারিতে তিনি ৫০ মিলিয়ন ইউরো গ্যারান্টিতে জামিনে মুক্তি পান।
মার্কিন নথি ও আন্তর্জাতিক লবিং অভিযানের অভিযোগ
সম্প্রতি বাংলা আউটলুক একটি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নথিতে তথ্য প্রকাশ করেছে। যদিও নথিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তাতে দাবি করা হয়েছে শেখ হাসিনাকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনায় ইউরোপ ও বলকান অঞ্চলের বিতর্কিত রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা যুক্ত রয়েছেন।
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে
মাল্টার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জোসেফ মাস্কাট, যিনি ইয়োরগেন ফেনেকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ২০২০ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ব্রিটিশ-বসনিয়ান রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী দামির ফাজলিচ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে অফশোর নেটওয়ার্ক ও অস্বচ্ছ আর্থিক চুক্তিতে জড়িত থাকার অভিযোগে পরিচিত।
এই যোগাযোগগুলোকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে গোপন লবিং কার্যক্রম সক্রিয় হয়েছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত এ কার্যক্রমের লক্ষ্য—
১. শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা,
২. তার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা,
৩. বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘ইসলামপন্থী মৌলবাদী’ হিসেবে উপস্থাপন করা,
৪. সরকার উৎখাতের ভিত্তি তৈরি করা।
নথি অনুসারে, মাল্টা, দুবাই ও লন্ডনে একাধিক বৈঠকে ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা, হাসিনার দূত এবং মার্কিন রাজনীতি ও আইনি অঙ্গনের প্রভাবশালীরা অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে ইরান সরকারের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কিত দেখানোর চেষ্টা চলছে।
ফাজলিচ ও বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগসূত্র
দামির ফাজলিচের সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ নেটওয়ার্ক (SSRN)-এর একটি গবেষণায় উল্লেখ আছে, ফাজলিচ কুখ্যাত ইতালীয় অপরাধী জিউসেপে সিমোনেলির ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ২০১০ সালে ইতালির অপারেশন দ্যু টোরে অভিযানে সিমোনেলি গ্রেফতার হন এবং ওই অভিযানে বাংলাদেশ থেকেও একজন আটক হয়েছিলেন।
নগদ লেনদেনের তথ্য
গোয়েন্দা মেমোতে আরও বলা হয়েছে, এই লবিং কার্যক্রম এখন সরাসরি নগদ লেনদেনের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক বছরের জন্য স্বাক্ষর হওয়া চুক্তির মূল্য ২০ লাখ ডলার (প্রায় ২৫ কোটি টাকা), আর অন্তর্বর্তী সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা সফল হলে দেওয়া হবে ২ কোটি ডলারের (প্রায় ২৫০ কোটি টাকা) ‘সাকসেস ফি’।

যদিও মার্কিন গোয়েন্দা নথির তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, তবে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে সালমান এফ রহমানের সঙ্গে সাংবাদিক হত্যার আসামি ইয়োরগেন ফেনেকের শক্ত ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। আন্তর্জাতিক লবিং অভিযানের অভিযোগ বাংলাদেশকে নতুন এক বিতর্কিত পর্বের মুখে দাঁড় করিয়েছে।











