ভ্যান চালক থেকে চিকিৎসক: নাটোরের ওমরের জীবনের আলো ও অদম্যতার গল্প
লেখক- আব্দুল মজিদ:
রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে, সমাজের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলা এক জীবনসংগ্রামের নাম- মোঃ তোহিদুল ইসলাম ওমর। নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার যোগীপাড়া গ্রামের এই মানুষটি এক সময় জীবিকার তাগিদে রাস্তায় রাস্তায় চালাতেন ভ্যান। আজ তিনি একজন দক্ষ ও পরিশ্রমী প্রাণী পল্লী চিকিৎসক-যার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে নাটোর ছাড়িয়ে অন্যান্য জেলায়। মাসে আয় করেন প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা।
সংগ্রাম ছোটবেলা থেকেই-১৯৭৭ সালের ২৫ জুন জন্ম নেওয়া তোহিদুল ইসলাম ওমরের জীবন যেন জন্ম থেকেই সংগ্রামের অনুশীলন। কৃষক বাবা হাবিবুর রহমান ও গৃহিণী মা আছমা বেগমের আট সন্তানের মধ্যে ওমর ছিলেন অন্যতম ভরসা।
১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক পাশ করার পরই ঘাড়ে এসে পড়ে সংসারের দায়িত্ব। কলেজে ভর্তি হওয়াই ছিল বিলাসিতা। ভাইবোনদের পড়ালেখার খরচ, সংসারের চাকা ঘোরাতে শুরু করেন দিনমজুরের কাজ। পরে জমানো টাকা দিয়ে কিনে ফেলেন একটি ভ্যান। সেই ভ্যানই হয় তার জীবনযাত্রার বাহন ও স্বপ্নপূরণের প্রথম সিঁড়ি।
অভাব-অনটন তাকে দমাতে পারেনি। প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে আয় করলেও শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা ছিল অটুট। ২০০৪ সালে ভর্তি হন নাটোর এম.কে কলেজে। ২০০৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। কিন্তু স্নাতক ডিগ্রির স্বপ্ন থেমে যায় অর্থাভাবে।
একটি প্রশিক্ষণ বদলে দেয় জীবনের মোড়-২০০৯ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের সার্জারি ও অবস্টেট্রিক্স বিভাগের আয়োজনে গবাদি পশুর কৃত্রিম প্রজনন ও চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন ওমর। এই প্রশিক্ষণের সনদপত্র তার জীবনের পথ বদলে দেয়।
গ্রামে ফিরে নিজ উদ্যোগে গবাদি পশুর চিকিৎসা, কৃত্রিম প্রজনন ও ডেলিভারির কাজ শুরু করেন। শুরুতে অনেকে সন্দেহ করলেও ধীরে ধীরে তার দক্ষতা ও আন্তরিকতা কৃষকদের আস্থাভাজন করে তোলে। সেবা, সততা ও পরিশ্রমের বদৌলতে আজ ‘ওমর একজন দক্ষ পল্লী ডাক্তার’ শুধু তার গ্রামে নয়-পাশের জেলাগুলোতেও পরিচিত এক নাম। গবাদি পশুর চিকিৎসা ও কৃত্রিম প্রজননের জন্য রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা থেকেও আসে ফোন। মাসে আয় করেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
তিনি শুধু নিজেকে নয়, দুই ভাই জয়নাল ও রহমত আলীকে এমএ পর্যন্ত পড়িয়ে দিয়েছেন। একজন এখন স্কুল শিক্ষক, আরেকজন এনজিও কর্মী। এছাড়া নিজ হাতে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন প্রায় ১০ জন বেকার যুবককে-যারা আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি দুর্ঘটনা, চলার পথে বাঁধা হয়-২০২১ সালের জুলাই মাসে পেশাগত কাজে যাওয়ার সময় এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাম পা ভেঙে যায়। চিকিৎসার পর হাঁটতে পারেন ঠিকই, কিন্তু বাইক চালানো বা বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকা আজও কষ্টকর। সরকারি প্রতিবন্ধী কার্ডে তাকে “মাঝারি শারীরিক প্রতিবন্ধী” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবন্ধীদের জন্য ওমরের দাবি, “প্রতিটি উপজেলায় প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা স্কুল, কলেজ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় থাকা উচিত। চিকিৎসা ও পুষ্টিসেবা, চাকরির কোটা-সব কিছুর সঠিক বাস্তবায়ন দরকার।” এই দাবি শুধু তার একার নয়, দেশের হাজারো প্রতিবন্ধী মানুষের কণ্ঠস্বর।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল্লাহ বলেন, “ওমরের মতো মানুষ আমাদের সমাজের জন্য গর্ব। অভাব-অনটনের মাঝেও সে আজ দৃষ্টান্ত।”
সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মোঃ কামরুল ইসলাম মন্তব্য করেন, “ওমর আমাদের এলাকার তরুণদের জন্য অনুেেপ্ররণা। তার জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে অনেক কিছু।”
ওমরের জীবন কেবল একজনের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের লাখো গ্রামের অচেনা অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা অদম্য মানুষের প্রতিচ্ছবি। যারা অভাবকে জয় করে, নিজেদের সীমাকে ছাপিয়ে, সমাজে আলো জ্বালায়। রাষ্ট্র যদি এমন মানুষদের পাশে দাঁড়ায়-তবে ওমরেরা হবেন আমাদের সত্যিকারের নায়ক।











