ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহারে শিশু-কিশোর ও যুবকদের স্বাবলম্বিতা: সম্ভাবনা ও করণীয়
বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেট কেবলমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং জ্ঞানার্জন ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার এক বিশাল সুযোগও এনে দিয়েছে। আজকাল শিশু, কিশোর ও যুবকদের অধিকাংশই স্মার্টফোন ব্যবহার করে ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সময় ব্যয় করে। কিন্তু যদি তারা এই প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে শিক্ষামূলক ও উপার্জনমূলক কাজে যুক্ত হয়, তবে তা তাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য দারুণ সহায়ক হতে পারে!
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ:
বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী তরুণদের একটি বড় অংশ দৈনিক কয়েক ঘণ্টা সময় সোশ্যাল মিডিয়া, গেমিং এবং বিনোদনমূলক কনটেন্টের পেছনে ব্যয় করে। Sensor Tower এবং Statista-র গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী তরুণদের ইন্টারনেট ব্যবহারের বড় একটি অংশ বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সীমাবদ্ধ ছিল। অপরদিকে, শিক্ষামূলক ও উৎপাদনশীল কাজে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC)-এর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি, যার মধ্যে তরুণদের উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ তরুণ শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও, খুব কমসংখ্যক ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার জন্য এর সদ্ব্যবহার করছে।
বর্তমানে অনলাইনে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে শিশু, কিশোর ও তরুণরা শিখতে এবং উপার্জন করতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু ক্ষেত্র হলো:
১. ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন কাজ: ফ্রিল্যান্সিং বিশ্বব্যাপী তরুণদের জন্য একটি বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। Upwork, Fiverr, Freelancer ও PeoplePerHour-এর মতো প্ল্যাটফর্মে গ্রাফিক ডিজাইন, কন্টেন্ট রাইটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিংসহ বিভিন্ন কাজে দক্ষতা অর্জন করে উপার্জন করা সম্ভব।
২. ইউটিউব ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন: বর্তমানে ইউটিউব এমন একটি মাধ্যম যেখানে জ্ঞানভিত্তিক, শিক্ষামূলক ও সৃজনশীল কন্টেন্ট তৈরি করে আয় করা সম্ভব। Google AdSense, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ইত্যাদির মাধ্যমে তরুণরা ইউটিউব থেকে অর্থ উপার্জন করতে পারে।
৩. ব্লগিং ও কনটেন্ট রাইটিং: যেসব তরুণ লেখালেখিতে দক্ষ, তারা নিজেদের ব্লগ তৈরি করে বা বিভিন্ন ওয়েবসাইটের জন্য কনটেন্ট লিখে আয় করতে পারে। Medium, WordPress, Blogger-এর মতো প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লিখলে বিজ্ঞাপন ও স্পন্সরশিপের মাধ্যমে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
৪. ডিজিটাল মার্কেটিং ও ই-কমার্স: বর্তমানে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসা করা যায়। এছাড়া, Daraz, Shopify, Amazon-এর মতো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজস্ব ব্যবসাও গড়ে তোলা সম্ভব।
৫. অনলাইন কোর্স ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট: যেকোনো শিশু, কিশোর ও তরুণ যদি নিয়মিতভাবে Google, Coursera, Udemy, Khan Academy, YouTube-এর মতো প্ল্যাটফর্ম থেকে শিক্ষামূলক ভিডিও ও কোর্স অনুসরণ করে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই তারা দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। এর ফলে তারা ফ্রিল্যান্সিং, চাকরি বা ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারবে।
সঠিক পথে পরিচালনার করণীয়:
১. সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা: অভিভাবকদের উচিত শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে উৎসাহ দেওয়া এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করা।
২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের ভূমিকা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এবং সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা প্রয়োজন।
৩. তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা: তরুণরা যেন শুধুমাত্র চাকরির পেছনে না ছুটে বরং নিজেদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে, সেজন্য অনুপ্রেরণা দেওয়া জরুরি!
উপসংহার: সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োগের মাধ্যমে শিশু, কিশোর ও যুবকদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ধরণ পরিবর্তন করা সম্ভব। যদি তারা গেমিং, বিনোদন ও সময় অপচয়ের পরিবর্তে শিক্ষামূলক ও দক্ষতাভিত্তিক কাজে মনোনিবেশ করে, তাহলে ভবিষ্যতে তারা নিজেদের শুধু আর্থিকভাবেই স্বাবলম্বী করতে পারবে না, বরং একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারবে। সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বেই তরুণরা ইন্টারনেটের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে!
টিপু সুলতানলে: লেখক ও গবেষক











